Header Ads Widget

Responsive Advertisement

গতির নতুন গল্প


 বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পুরোনো ছবিটা কেমন ছিল? নতুন বল হাতে একজন স্পেশালিস্ট পেসারকে খুঁজে পাওয়ার আকুতি, তারপর তাকে কাচের পাত্রের মতো সামলে রাখার চেষ্টা। ম্যাচের শুরুতেই ট্রাউজারের পকেটে হাত দিয়ে অধিনায়ক ভাবতেন—কখন বলটা তুলে দিতে পারব সাকিব-রাজ্জাক-রিয়াদদের হাতে!

কিন্তু গত ১৬ আগস্টের নরম আলোয় ডারউইন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে যা ঘটল, তা কোনো সাধারণ ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যান নয়। তা আস্ত এক যুগের খোলস বদলে ফেলার গল্প। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে পেস দিয়ে কাঁপিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট জয়! দাপুটে এই জয়ের পর গল্পটা এখন আর শুধু জেতার নয়, গল্পটা বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের নতুন পরিচয়েরও।

ডারউইনের উইকেটে তখন মৃদু বাতাস। হাসান মাহমুদ বলটা হাতে নিয়ে রানআপে দাঁড়ালেন—মুখে সেই শান্ত, নিপট ভালো ছেলের শান্ত মুখ। শান্ত অথচ বল হাতে ছুটতেই তার পেছনে লুকিয়ে থাকা আগুনটা যেন ঠিকরে বেরিয়ে এলো।

প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের ১৯৮ রানে গুঁড়িয়ে দেওয়া, আর দ্বিতীয় ইনিংসে আরও তিনটি নিখুঁত থাবা। পুরো ম্যাচে ৯/১১১—পরিসংখ্যান হয়তো ডারউইনের স্কোরবোর্ডে মুছে যাবে; কিন্তু অজিদের মনে যে ক্ষতের সৃষ্টি হাসান করেছেন, তা যে সহজে মুছবে না, সেটি অনুমেয়। বল হাতে হাসানের প্রতিটি সুইং জানান দিচ্ছিল—‘দিন বদলেছে, এবার ডারউইন আমাদের।’

কত চোট, কত কান্না, কত রিহ্যাবের রাত পার করে আজ এই তাসকিন! তার দীর্ঘ স্পেল, শরীরের ক্লান্তি ভুলে গতির ঝড় আর প্রথম ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন-দ্বিতীয় ইনিংসে স্টার্ককে সাজঘরে ফেরানো—সব মিলিয়ে তাসকিন এখন কেবল পেসার নন, এই তরুণ আক্রমণের মানসিক শক্তির প্রতীক।

আর বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই রূপকথার রোমাঞ্চকর আরেক চরিত্র নাহিদ রানা। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির এই দীর্ঘদেহী তরুণের চোখের দিকে তাকালে গতি ছাড়া আর কিছুরই দেখা মেলে না। উইকেটের ওপর ধেয়ে আসা ১৫২ কিলোমিটারের ঝড়ে যিনি আগেই কাঁপিয়ে দিয়েছেন ক্রিকেটবিশ্বকে। যদিও ডারউইনের ঐতিহাসিক এই লড়াইয়ে নাহিদ একাদশে ছিলেনই না! ইনজুরির কারণে ছিলেন না আরেক কার্যকর পেসার শরীফুলও। সেই নাহিদ-শফিউলদের ছাড়া নামা এক বাংলাদেশই ধ্বংস করে দিল স্বাগতিকদের শক্ত ব্যাটিং লাইনআপ। হাসান আঘাত হানলেন, তাসকিন চাপ ধরে রাখলেন, এবাদত লাইন-লেন্থে পিষে ফেললেন অজিদের।

৪২৬ রানের পাহাড় গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪-তে থামিয়ে দেওয়া, তারপর মোটে ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করে লেখা হলো পরিবর্তনের এক ইতিহাস। এ কেবল এক সাধারণ ম্যাচ জয় নয়। এটি লাল-সবুজের ক্রিকেটে এক নতুন যুগের দলিল।

এক সময় যে বাংলাদেশ স্রেফ দু-একজন স্পিনারের ভেল্কির ওপর ভর করে ম্যাচ জেতার স্বপ্ন দেখত, ডারউইনের ড্রেসিংরুমে আজ তারা পেস আক্রমণের হুংকার দিয়ে চলছেন। হাসান মাহমুদ সামনে হাঁটছেন, তাসকিন শক্ত হাতে হাল ধরে আছেন, আর নেটে গতির ঝড় তোলার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন নাহিদ রানা। এবাদত-শরীফুল তো আছেই।

এমন দৃশ্য চিত্রায়নে স্পষ্ট বাংলাদেশের পেস বিপ্লব এখন আর দূরের কোনো স্বপ্ন নয়, ভবিষ্যতের কোনো গল্পও নয়, বাস্তব। রোববার বিকেলে ডারউইনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটবিশ্বকে জানান দিয়েছে—পেসের এই নতুন গর্জনই এখন আমাদের আসল বর্তমান!


সুত্রঃ কালবেলা

Post a Comment

0 Comments