Header Ads Widget

Responsive Advertisement

প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখার অভ্যাসে মিলতে পারে যেসব স্বাস্থ্য উপকারিতা

 প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখার অভ্যাসে মিলতে পারে যেসব স্বাস্থ্য উপকারিতা


নিচে তাহাদ নিউজ ২৪-এর জন্য একটি পেশাদার, তথ্যভিত্তিক এবং সংবাদধর্মী ফিচার প্রতিবেদন দেওয়া হলো।

সূর্যাস্ত দেখা শুধু সৌন্দর্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যেরও ওষুধ! বলছে গবেষণা

তাহাদ নিউজ ২৪ ডেস্ক:
দিনের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে সোনালি, কমলা আর গোলাপি রঙে আকাশকে রাঙিয়ে তোলে, তখন অনেকেই কিছুক্ষণ থেমে সেই দৃশ্য উপভোগ করেন। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই হালকা হয়ে যায়। তবে সূর্যাস্তের এই সৌন্দর্য শুধু চোখের প্রশান্তিই নয়, মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, নিয়মিত সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয় দেখার অভ্যাস উদ্বেগ কমাতে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে এবং ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কেন সূর্যাস্ত মানুষকে এতটা মুগ্ধ করে?

মনোবিজ্ঞানীরা এই অনুভূতির নাম দিয়েছেন ‘অ’ (Awe) বা বিস্ময়বোধ। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা, যখন কোনো বিশাল, অসাধারণ বা মনোমুগ্ধকর দৃশ্য মানুষের মনে গভীর বিস্ময় সৃষ্টি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিশেল শিওটার মতে, সূর্যাস্তের মতো দৃশ্য মানুষকে নিজের ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে সাময়িকভাবে দূরে নিয়ে যায়। ফলে মানসিক চাপ কমে এবং জীবনকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।

তিনি বলেন, মানুষ যখন নিজের উদ্বেগের মধ্যে আটকে থাকে, তখন মানসিক চাপ বাড়ে। কিন্তু প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য সেই চিন্তার চক্র ভেঙে মানুষকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে।

প্রকৃতিই সবচেয়ে বেশি বিস্ময় সৃষ্টি করে

গবেষণায় দেখা গেছে, সংগীত, শিল্পকর্ম কিংবা ধর্মীয় অভিজ্ঞতা থেকেও মানুষ বিস্মিত হতে পারে। তবে প্রকৃতির সৌন্দর্যই মানুষের মনে সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলে।

২০২৩ সালের এক গবেষণায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তকে সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেনিফার স্টেলার বলেন, সূর্যাস্তের সময় আকাশের রঙের পরিবর্তন ও বিশালতা মানুষকে এমন এক অভিজ্ঞতা দেয়, যা সহজেই গভীর বিস্ময়বোধ তৈরি করে।

স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা মানুষের মনোযোগ বাড়ায় এবং নতুন তথ্য মনে রাখতে সহায়তা করে।

একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বিস্ময় জাগানো একটি ভিডিও দেখানোর পর একটি গল্প শোনানো হয়। পরে দেখা যায়, যারা সেই ভিডিও দেখেছিলেন তারা অন্যদের তুলনায় গল্পের তথ্য অনেক বেশি নির্ভুলভাবে মনে রাখতে সক্ষম হন।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের অভিজ্ঞতা মানুষের মনকে পুরোপুরি বর্তমান মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত করে, যা স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সহায়ক।

মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর

কোভিড-১৯ মহামারির সময় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন বা বিস্ময়বোধ তৈরি হয় এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিলেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

আরেকটি গবেষণায় বয়স্কদের নিয়মিত প্রকৃতির মধ্যে হাঁটার পরামর্শ দেওয়া হলে দেখা যায়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কম এবং চারপাশের প্রকৃতি নিয়ে বেশি কথা বলতে শুরু করেন।

সহমর্মিতা বাড়ায়

গবেষকদের মতে, বিস্ময়বোধ মানুষের সামাজিক আচরণেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা বিশাল ইউক্যালিপটাস গাছ দেখে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়েছিলেন, তারা পরবর্তীতে অন্যদের সাহায্য করতে তুলনামূলক বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের চেয়ে অনেক বড় ও সুন্দর কিছু দেখলে মানুষের মধ্যে বিনয় এবং সহমর্মিতার অনুভূতি বাড়ে।

প্রদাহ কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে

আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত আনন্দ, কৃতজ্ঞতা বা বিস্ময়বোধ অনুভব করেন, তাদের শরীরে প্রদাহের সূচক হিসেবে পরিচিত সাইটোকাইন তুলনামূলক কম থাকে।

উচ্চমাত্রার সাইটোকাইন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

ভালো ঘুমের জন্যও উপকারী

বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্যাস্ত শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

দিনের আলো কমে এলে শরীরে মেলাটোনিন হরমোন তৈরি শুরু হয়, যা ভালো ঘুমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপরীতে দিনের আলো কর্টিসল হরমোন তৈরি করে, যা শরীরকে কর্মক্ষম রাখে।

নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাইয়ের গবেষক অধ্যাপক মারিয়ানা ফিগেইরোর মতে, নিয়মিত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আলো দেখা শরীরের প্রাকৃতিক ছন্দ বজায় রাখতে সহায়ক। তবে সূর্যাস্তের পর অতিরিক্ত মোবাইল বা কম্পিউটারের নীল আলো ব্যবহার করলে সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে কয়েক দিন কিছু সময় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত উপভোগ করার অভ্যাস মানসিক প্রশান্তি, ভালো ঘুম, স্মৃতিশক্তি উন্নয়ন এবং উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

প্রকৃতির এই নীরব সৌন্দর্য মানুষকে শুধু মুহূর্তের আনন্দই দেয় না, বরং মনে করিয়ে দেয়—ব্যস্ত জীবনের মাঝেও কখনো কখনো একটু থেমে চারপাশের সৌন্দর্য অনুভব করাও সুস্থ থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

তাহাদ নিউজ ২৪ ডেস্ক

Post a Comment

0 Comments