সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ভিডিওতে থাকা তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করলেও বিয়ের তারিখ, সিসিটিভি ফুটেজের সময় এবং বিভিন্ন নথিপত্রে অসঙ্গতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
ভিডিও ভাইরালের পর গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, মরিয়ম বেগম নামের ১৮ বছর বয়সী ওই তরুণীর সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে ২০২৬ সালের ১৭ জুন। তার দাবি, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে পারিবারিকভাবে দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম বেগমের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে বিয়ে হয়।
তবে ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজের সময় নিয়ে তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক। ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ছড়িয়ে পড়া মূল ফুটেজে থাকা টাইমস্ট্যাম্প অনুযায়ী ভিডিওটি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ধারণ করা। ফলে এমপির দাবি করা ২০২৬ সালের বিয়ের তারিখের সঙ্গে ফুটেজের সময়ের প্রায় তিন বছরের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, ওই নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। বিয়ের কাবিন আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে গাজী নজরুল জানান, তাদের কাছে কাবিন নেই। তবে যিনি বিয়ে নিবন্ধ করেছেন তার কাছ থেকে সংগ্রহ করে দেওয়া যাবে।
‘ওইটা আছে বিবাহ যিনি রেজিস্ট্রি করেছেন তার খাতায়। ওটা নিয়ে দিতে হবে। ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে’, বলেন তিনি।
এদিকে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ ডিসেন্টকে বলেন, ‘৩ লাখ টাকা দেনমোহরে গত ১৭ জুন আমার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় গাজী নজরুল ইসলামের। ওইদিন উনারা আমার অফিসে (মগবাজার) এলে রেস্ট নিচ্ছিলেন ওখানেই। সেখান থেকে ভিডিওটি ধারণ হয়। এর সঙ্গে আমার শ্যালক ওবায়দুল্লাহ জড়িত। সে আমার অফিসে সহকারী হিসেবে কাজ করতো।’
জামায়াতের এ সংসদ সদস্যের নির্বাচনী হলফনামা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জমা দেওয়া এমপির হলফনামায় দ্বিতীয় স্ত্রীর কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না বলে জানা গেছে। এ ছাড়া জামায়াতের স্থানীয় নেতারাও জানিয়েছেন, এমপি তাদের দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি জানালেও বিয়ের নির্দিষ্ট তারিখ বা কোনো নথি সম্পর্কে দলীয়ভাবে আগে থেকে অবগত ছিলেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথিত কাবিননামা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে ওই নথির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে মরিয়ম খাতুনের একটি বায়োডাটা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এই নথির সত্যতাও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ভাইরাল বায়োডাটায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের ২২ জুন গাজী নজরুল ইসলাম সবুজ কালিতে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু সেখানে মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থার ঘরে ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে। এমপির দাবি অনুযায়ী বিয়ে যদি ১৭ জুন হয়ে থাকে, তাহলে বিয়ের পাঁচ দিন পরও কেন ওই নথিতে তাকে অবিবাহিত দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ভাইরাল ভিডিও প্রসঙ্গে গাজী নজরুল ইসলাম লিখিত বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ঘটনাটি মগবাজারের একটি ব্যবসায়িক কার্যালয়ের। তার দাবি, ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই তিনি প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহকে নিয়ে ওই কার্যালয়ে যান। সেখানে অবস্থানের সময় চালক পরিকল্পিতভাবে কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন।
এমপির অভিযোগ, পরে ওই ব্যক্তিরা তাদের পরিচয় জানতে চেয়ে হয়রানি করেন এবং একপর্যায়ে নিচে একটি চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা দেওয়ার পর তারা মুক্ত হন।
গাজী নজরুল ইসলামের দাবি, পুরো ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন তার গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেছেন, পূর্বশত্রুতার জেরে চালক সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তিনি এটিকে তার ও পরিবারের বিরুদ্ধে ‘চরিত্র হননের অপচেষ্টা’ এবং ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে ভিডিও, বিয়ের তারিখ, হলফনামা ও বিভিন্ন নথিতে থাকা অসংগতিগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো স্বাধীন তদন্ত বা আইনগতভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেছেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও দলটির মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে। তবে ভিডিওটি কীভাবে এবং কার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, সে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।’
দ্বিতীয় বিয়ে কবে হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিয়ের সুনির্দিষ্ট তারিখ আমার জানা নেই। তবে বেশ কিছুদিন আগে বিয়েটি সম্পন্ন হয়েছে বলে আমরা জেনেছি।’
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার ‘কথিত’ দ্বিতীয় স্ত্রী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সুত্রঃ কাল বেলা
0 Comments