১২ বছরের ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক
তাহাদ নিউজ ২৪ ডেস্কঃ
নেত্রকোণার মদন উপজেলায় ১২ বছরের এক মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণের ফলে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। তবে অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর পলাতক রয়েছেন।
মামলার এজাহার ও স্থানীয়রা জানায়, শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর মদন উপজেলার মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা বেঁচে নেই। মা জীবিকার তাগিদে সিলেটে গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন। ভুক্তভোগী শিশুটি তার নানির কাছে থেকে ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। কাউকে কিছু না জানাতে ছাত্রীকে প্রাণনাশের ভয় দেখান শিক্ষক আমান। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখ ওই শিক্ষক ছুটি নিয়ে যাওয়ার পর আর মাদ্রাসায় আসেননি বলে জানিয়েছেন মাদ্রাসার আরেক শিক্ষক। আর ভুক্তভোগী শিশুটি গত পাঁচ মাস ধরে মাদ্রাসায় আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
পরবর্তীতে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন দেখে সন্দেহ হয়। তখন তার মা সিলেট থেকে এসে মেয়েকে অভয় দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারে বিষয়টি। শিশুটি মাদ্রাসার শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে বলে তার মাকে জানায়। এরপর শিশুটিকে নিয়ে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তারকে দেখান এবং তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান মেয়েটি ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
ডা. সায়মা আক্তার জানান, বাচ্চাটি তার মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে আসে এবং জানায় যে তার পেট সবসময় ভারী লাগে এবং পেটের ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে বলে মনে হয়। চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে দেখতে পান যে বাচ্চাটি প্রচণ্ড রক্তশূন্যতায় ভুগছে। তার শরীরে রক্ত নেই বললেই চলে।
ডা. সায়মা আক্তার আক্ষেপ করে জানান, ১১ বছর বয়সী এই শিশুটির আসলে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে গাইনোকোলজিস্টের কাছে আসতে হয়েছে এমন একটি সমস্যা নিয়ে, যা সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। মেয়েরা জন্মের সময় থেকেই ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু নিয়ে জন্মায়। সাধারণত ১১-১২ বছর বয়সে এই ডিম্বাণুগুলো পূর্ণতা পায় এবং প্রথম মাসিকের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শিশুটি তার জীবনের প্রথম মাসিক হওয়ার অভিজ্ঞতা পাওয়ার আগেই গর্ভবতী হয়ে পড়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে শিশুটি এবং তার পরিবার বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
শিশু ছাত্রীর বরাতে তিনি জানান, ওই মাদ্রাসার শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর এই শিশু ছাত্রীকে একাধিকবার পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে। শিক্ষকের দ্বারাই পৈশাচিক নির্যাতনের কথা বলার সময় শিশু ছাত্রী আতঙ্ক ও ভয় পায় এবং এদিক ওদিক দৃষ্টি দেয়।
প্যাথলজিক্যাল ও চিকিৎসকের সূত্রে জানা যায়, সিমফাইসিও ফান্ডাল হাইট (পেটের হাড় থেকে জরায়ুর উচ্চতা) পরীক্ষা করে দেখা যায় যে বাচ্চার বয়স প্রায় ২৭ সপ্তাহের বেশি (প্রায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাস)। শিশুটির বয়স ১১ বছর, উচ্চতা ৪.৫ ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। শিশুটির পেলভিসের (কোমরের হাড়) মাপ প্রায় ৫০-৫৫ মিলিমিটার। গর্ভস্থ শিশুটির বাইপ্যারাইটাল ডায়ামিটার (মাথার দুপাশের হাড়ের দূরত্ব) প্রায় ৭৪ মিলিমিটার। চিকিৎসক উল্লেখ করেছেন যে, শিশুটির সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ বাচ্চার মাথার মাপ অনেক বেশি, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাচ্চাটির রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৮.২, যা মারাত্মক রক্তস্বল্পতার লক্ষণ।
এছাড়া সে অপুষ্টি এবং কৃমির সমস্যায়ও ভুগছে। সরু পেলভিসের ভেতর দিয়ে বড় মাথার বাচ্চা প্রসব করা স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়, যা মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ডেলিভারি প্রায় অসম্ভব। শুধু ক্র্যানিওটমি (বাচ্চার মাথা কেটে বের করা) পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাভাবিক ডেলিভারি করা যেতে পারে, যা একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। ১১ বছরের এই ছোট বাচ্চার শরীরে সিজারিয়ান সেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেস্থেসিয়া বা ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
জানা যায়, শিশুটি বর্তমানে প্রচণ্ড ভয়ের মধ্যে রয়েছে। যখন সে চিকিৎসকের চেম্বারে প্রথম প্রবেশ করে তখন সে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ মুখ খুলে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারেনি। শিশুটি এবং তার পুরো পরিবার এই ঘটনায় মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত বা ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছে। শিশুটি এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না যে তার সাথে ঠিক কী ঘটে গিয়েছে বা ভবিষ্যতে তার সঙ্গে কী হতে যাচ্ছে।
পলাতক থাকায় এব্যাপারে অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা ও শিক্ষক মো. ছোটন মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, “অভিযুক্ত আমান উল্লাহ সাগর ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে না। তিনি স্ত্রী সন্তানসহ পলাতক রয়েছেন। এমনকি গ্রামের কোনো মানুষের সঙ্গে বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে না।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মদন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, ২৩ এপ্রিল ভুক্তভোগী মা থানায় মামলা করেছেন। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পালিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই, যেখানেই থাকুক যেভাবেই থাকুক দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

0 Comments