Header Ads Widget

Responsive Advertisement

কেন হাসিনাকে ফেরত দেবে না ভারত?

 

শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি


কেন হাসিনাকে ফেরত দেবে না ভারত?


ফুটবল অনুশীলনের মাঝখানে ২৪ বছর বয়সী শিমা আক্তারকে হঠাৎই তার বন্ধু জানালেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর কাছে মুহূর্তটি ছিল ‘বিচারের’ এক প্রতীকী জয়।

গত বছর শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিমার কয়েকজন বন্ধু নিরাপত্তাবাহিনীর দমন-পীড়নে নিহত হন। মাসব্যাপী বিচার শেষে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৭৮ বছর বয়সী হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

“ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভাবতেন তাকে কেউ হারাতে পারবে না,” বলেন শিমা। “আমাদের শহীদদের জন্য এটা ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ,” বলেন তিনি। 

তবে তার দাবি—এটাই যথেষ্ট নয়। “আমরা চাই তাকে ঢাকাতেই ফাঁসি দেওয়া হোক।” কিন্তু এটি সহজ নয়।

২০২৪ সালের আগস্টে গণবিক্ষোভের মুখে বাসভবন ছেড়ে পালানোর পর থেকেই হাসিনা ভারতীয় রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে আছেন। বাংলাদেশ বারবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ করলেও ভারত তা মানেনি।এ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন বাড়ছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর সেই উত্তেজনা আরও বাড়বে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

‘ভারত পরবর্তী-হাসিনা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইলেও তাকে ঢাকায় ফেরত পাঠিয়ে মৃত্যুদণ্ডের মুখে ঠেলে দেবে—এমনটা কল্পনা করাও কঠিন’, বলছেন দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞরা।

ভারতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “দিল্লি কীভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে?”

ভারতের মূল যুক্তি

হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী; শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা।

১৯৯৬ সালে প্রথম ক্ষমতায় এসে ২০০১ সালের বিপর্যয়ের পর ২০০৯ সালে আবার বিজয়। এরপর পরপর ১৫ বছর ক্ষমতায়—যা ছিল বিরোধী দলকে কোণঠাসা করা, গুম-খুন ও নির্যাতনের অভিযোগে ঘেরা।

তার সরকারের উন্নয়নচিত্রও সমালোচনার মুখে পড়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিরাপত্তাবাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন দেশজুড়ে বিক্ষোভে রূপ নেয়। জাতিসংঘের হিসেবে এতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়।

এরপর ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে ভারতে যান। আর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে। তিনি ভারতের আচরণ নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনায় মুখর। ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে দ্রুত শীতলতা আসে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বলেছে, দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে বাধ্যতামূলকভাবে হাসিনাকে ফেরত দিতে হবে। তাকে আশ্রয় দেওয়া ‘অমিত্রসুলভ আচরণ’ বলে ঢাকা অভিযোগ করেছে।

কিন্তু ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন—চুক্তিতে একটি স্পষ্ট ব্যতিক্রম আছে, যদি অপরাধ “রাজনৈতিক চরিত্রের” হয়।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় ভারদ্বাজ বলেন, “ভারতের দৃষ্টিতে হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার রাজনৈতিক প্রতিশোধ।”

ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ‘অ্যান্টি-ইন্ডিয়া’ মনোভাবাপন্ন; তাই হাসিনাকে ফেরত দেওয়া মানে তাদের বৈধতা দেওয়া।

নতুন নির্বাচনের অপেক্ষা

ভারত বলেছে, তারা রায়ের বিষয়টি “নোট করেছে” এবং “সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করবে।”

তবুও বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক ঠাণ্ডা। চক্রবর্তীর ভাষায়, “এই সরকার ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত সম্পর্ক উত্তপ্তই থাকবে।”

আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ভারতে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ ভোটে অংশ নিতে পারবে না। বিএনপিসহ বড় দলগুলোও সাধারণত দিল্লির সমালোচক। তবুও একটি নির্বাচিত সরকার ভারতের পক্ষে কাজ করা সহজতর হবে বলে মনে করেন চক্রবর্তী।

জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্রীরাধা দত্ত বলেন, ভারত জনমনে হাসিনার প্রতি ক্ষোভ বুঝে। তবে আদর্শভাবে দিল্লি ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করতেই স্বচ্ছন্দ। কিন্তু বাস্তবতা—বাংলাদেশ হাসিনাকে আর সুযোগ দেবে না।

“ভারতের এখন নতুন শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির প্রয়োজন,” বলেন দত্ত।

হাসিনাকে নিয়ে ভারতের নৈতিক ও কৌশলগত হিসাব

দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক এবং বাণিজ্যিক। বড় উত্তেজনার মধ্যেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ছে। তবু ভারত সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গেই।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভাঙন ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের ভূমিকা—দুই দেশের সম্পর্কের সূচনা; আর হাসিনা একসময় নয়াদিল্লিকে নিজের বাড়ি হিসেবেই বিবেচনা করতেন।

১৯৭৫ সালের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ভারতই তাকে আশ্রয় দেয়। পরে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক মিত্র ছিলেন তিনি।

সেই সম্পর্কেই ২০২৪ সালে ক্ষমতা হারালে তিনি দিল্লিতে আশ্রয় নেন। ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের তত্ত্বাবধানেই তিনি সেখানে নিরাপদে পৌঁছান।

“আমরা তাকে এবার আমন্ত্রণ জানাইনি,” বলেন চক্রবর্তী। “কিন্তু তিনি তখনো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর কোথায়ই বা যেতে পারতেন?”

তার প্রশ্ন—“মৃত্যুদণ্ডের মুখে তিনি কীভাবে বাংলাদেশে ফিরবেন? ভারতকে নৈতিক অবস্থান নিতে হবে।”

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষক মাইকেল কুগলম্যান বলেন, হাসিনাকে ভারত রাখলে সম্পর্কের কাঁটা হয়তো থাকবে, কিন্তু দিল্লি তার মিত্রদের প্রতি অনুগত—এটাই এর বার্তা। দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য পুনরুত্থানের ক্ষেত্রেও এতে ভারতের লাভ হতে পারে।

“দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতির ইতিহাস বলছে, বংশীয় দলগুলো কঠিন সময় পার করে, কিন্তু বিলীন হয় না,” বলেন কুগলম্যান।

“তারা টিকে থাকে—আর রাজনৈতিক পালাবদলের মুহূর্তে ফিরে আসার সুযোগ পায়।”

সূত্র: নিউজ ২৪

Post a Comment

0 Comments